বাংলাদেশ   শনিবার ১০ জানুয়ারি ২০২৬, শনিবার ২৬ পৌষ ১৪৩২

বিশ্বের জন্য আরেকটি দৃষ্টান্ত হবে ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক: সিডিএফ

মো: নাঈমুর রহমান

প্রকাশিত: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৪৭ AM

বিশ্বের জন্য আরেকটি দৃষ্টান্ত হবে ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক: সিডিএফ

ছবি: সংগৃহীত

 

ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করা হবে বিশ্বের জন্য বাংলাদেশের আরেকটি নতুন উদ্ভাবন ও দৃষ্টান্ত। এ ধরনের ব্যাংক হলে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোর ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হবে।

ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর জাতীয় নেটওয়ার্ক ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ) গতকাল বৃহস্পতিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা বলেছে। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত সিডিএফের সদস্য প্রায় ৫০০ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান।

ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক ক্ষুদ্রঋণবান্ধব নয়; বরং মুনাফার জন্য করা হচ্ছে বলে কেউ কেউ বিতর্কের সৃষ্টি করছেন, আবার কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ ব্যাংক ও মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) দ্বৈত নিয়ন্ত্রণে ক্ষুদ্রঋণ খাত চলবে—এ কথা উল্লেখ করে সিডিএফ বলেছে, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য অধ্যাদেশ প্রণয়নের প্রস্তাব একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের আওতায় সঞ্চয় নেওয়া যাবে সবার কাছ থেকে। চড়া সুদে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে আর ঋণ নেওয়ার দরকার পড়বে না।

খসড়া অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক ঋণ কার্যক্রম, বিমা সেবা, প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) এবং দেশি-বিদেশি অনুদান ও ঋণ নিতে পারবে। এ ছাড়া ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও কুটির শিল্পের পাশাপাশি কৃষি খাতে ঋণের পরিধি বাড়ানো সম্ভব হবে।

প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক সামাজিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করবে। অধ্যাদেশের খসড়ার এ কথা উল্লেখ করে সিডিএফ বলেছে, সামাজিক ব্যবস্থা হচ্ছে এমন ধরনের উদ্যোগ, যেখানে উদ্যোক্তা বা বিনিয়োগকারীরা সামাজিক সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যক্তিগত লাভ বা মুনাফার আশা ছাড়াই বিনিয়োগ করেন। তাই এ ব্যাংক ক্ষুদ্রঋণ খাতে অনৈতিক চর্চা, অতিরিক্ত মুনাফার লোভ ও সুশাসন–সংকটের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে মর্মে যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে, তা অমূলক। এ ব্যাংকে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ হিসাবে পরিশোধ করা অর্থের পরিমাণ তাদের মোট বিনিয়োগের অতিরিক্ত হবে না।

সিডিএফ বলেছে, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক করার সুযোগ তৈরি হলে তা সব ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকে রূপান্তর করার জন্য বাধ্য করবে না। কোনো ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান বা এনজিও যদি চায় সম্পূর্ণ এনজিওকে ব্যাংকে রূপান্তর করতে, সে ক্ষেত্রে সেই সুযোগ থাকবে। কেউ যদি তা চায় বর্তমান এনজিওর আংশিক বা কিছু শাখা স্থানান্তর করতে, তাহলে সে অংশটুকুই স্থানান্তর হবে। সে ক্ষেত্রে স্থানান্তরিত অংশটুকু ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক হিসেবে সম্পূর্ণ আলাদা কাঠামো ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হবে। অর্থাৎ একই কাঠামো ও ব্যবস্থাপনায় তা চলবে না।

সিডিএফের মতে, এনজিও চলবে এনজিওর মতো, যার নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ হবে এমআরএ এবং যে অংশটুকু ব্যাংকে স্থানান্তর হবে, সেটুকুর নিয়ন্ত্রণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। কোনোভাবেই দ্বৈত নিয়ন্ত্রণে প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক পরিচালিত হবে না। কোনো এনজিও তার সম্পদের যে অংশটুকু ব্যাংকে স্থানান্তর করবে, সেই অংশটুকুরই দায়-দেনা স্থানান্তর করবে।

সিডিএফ বলেছে, প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের ৬০ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা থাকবে গরিব সদস্যদের হাতে। অধিকাংশ শেয়ারহোল্ডার গরিব সদস্য হওয়ার অর্থই হচ্ছে তাদের ক্ষমতায়ন হবে। ব্যাংকের লভ্যাংশ তাদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এতে সাধারণ গরিব সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না; বরং বিশেষভাবে উপকৃত হবেন। এ ধরনের মালিকানার উদাহরণ বাংলাদেশে গ্রামীণ ব্যাংকে আছে। গ্রামীণ ব্যাংকের প্রায় ৯০ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা গরিব সদস্যদের হাতে।

প্রচলিত ব্যাংক মূলত মুনাফাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক হলে ক্ষুদ্রঋণ খাত মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠী এ সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন—এমন আশঙ্কা ঠিক নয় বলে মনে করছে সিডিএফ। ফোরামটি বলেছে, প্রস্তাবিত ব্যাংক মুনাফার জন্য করা হবে না। এটি হবে সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান, যার সেবা হবে বহুমাত্রিক। এ ধরনের ব্যাংকের উদ্যোক্তারা শুধু তাদের বিনিয়োগকৃত মূলধনের সমপরিমাণ টাকা ফেরত নিতে পারবেন।

সিডিএফ বলেছে, দেশের প্রচলিত ব্যাংকিং ধারণা থেকে অনেক উন্নত ধারণা ও ব্যতিক্রমধর্মী পদক্ষেপ হচ্ছে প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক। এ ব্যাংকের মালিকানায় থাকবে ৬০ শতাংশ গরিব সদস্য এবং বাকি ৪০ শতাংশ থাকবে প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির হাতে। যেহেতু বিনিয়োগকৃত মূলধনের অতিরিক্ত মুনাফা বা লভ্যাংশ নেওয়ার সুযোগ নেই, তাই কোনো ব্যক্তি মুনাফা লাভের আশায় এ ধরনের বিনিয়োগ করতে আসবেন না। তাই ৪০ শতাংশ বিনিয়োগ আসবে মূলত বিভিন্ন এনজিওর উদ্বৃত্ত তহবিল থেকে। তাই যেটুকু মুনাফা হবে, তা আবার সদস্যদেরই ঘুরেফিরে উপকার করবে।

সিডিএফ আরও বলেছে, এশিয়া ও আফ্রিকার সব দেশেই ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের আইন রয়েছে, যা মূলত মুনাফাভিত্তিক বিনিয়োগ। অন্যদিকে আমাদের প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সামাজিক। মুনাফা মূল উদ্দেশ্য না হওয়ার বদলে মূল উদ্দেশ্য যেহেতু সামাজিক সমস্যার সমাধান করা, অর্থাৎ দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান ও নতুন নতুন উদ্যোগকে সহায়তা করা, তাই ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকগুলো হবে বিশ্বের জন্য বাংলাদেশের আরেকটি নতুন উদ্ভাবন ও দৃষ্টান্ত।

 

বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!