কিশোর অপরাধ আজ আর বিচ্ছিন্ন কোনো পারিবারিক বা ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প নয়; এটি ক্রমেই একটি সামাজিক বাস্তবতা, যার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। প্রযুক্তির সহজলভ্যতা কিশোরদের হাতে যে বিপুল ক্ষমতা তুলে দিয়েছে, তা যেমন তাদের জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও বিশ্বদৃষ্টিকে প্রসারিত করেছে, তেমনি অনিয়ন্ত্রিত ও অসম্পাদিত এ ডিজিটাল জগৎ তাদের মানসিক গঠনে তৈরি করেছে নানা জটিলতা।
কৈশোর এমন একটি সময়, যখন মানুষ নিজেকে খুঁজতে চায়, স্বীকৃতি পেতে চায়, ভিড়ের মধ্যে আলাদা হয়ে উঠতে চায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এ চাহিদাকে আরও উসকে দেয়। লাইক, শেয়ার, ভিউ আর কমেন্টের সংখ্যাই যেন হয়ে ওঠে জনপ্রিয়তা ও সাফল্যের মানদণ্ড। এই প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা অনেক কিশোরকে ঠেলে দেয় ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে, যেখানে অপরাধও কখনো কখনো হয়ে ওঠে হিরো হওয়ার শর্টকাট পথ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংস ভিডিও, অপরাধের গল্প, গ্যাং কালচার কিংবা তথাকথিত ‘বোল্ড’ জীবনযাপনের প্রদর্শন কিশোরদের কাছে এক ধরনের রোমাঞ্চকর বাস্তবতা তৈরি করে। বাস্তব জীবনের পরিণতি, আইনি জটিলতা বা নৈতিক দায়বদ্ধতা সেখানে প্রায় অনুপস্থিত থাকে। ফলে অপরাধকে অনেক সময় তারা অপরাধ হিসেবেই দেখতে শেখে না; বরং এটিকে দেখে ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে। ভার্চুয়াল জগতে কোনো অপরাধমূলক ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হলে অপরাধীকে ঘিরে তৈরি হয় আলোচনার ঝড়। এ আলোচনাই কিশোর মনে বপন করে ভ্রান্ত বার্তা যে অপরাধ মানেই পরিচিতি। বিশেষ করে যেসব কিশোর পারিবারিক নজরদারির বাইরে থাকে, যাদের জীবনে আবেগগত শূন্যতা বা হতাশা কাজ করে, তারা এ ভ্রান্ত আকর্ষণের ফাঁদে দ্রুত জড়িয়ে পড়ে।
সাইবার বুলিং, অনলাইন গ্যাং গঠন, মাদক বা অস্ত্রের প্রচার—এসবও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে কিশোর অপরাধকে সংগঠিত ও ত্বরান্বিত করছে। আগে যেখানে অপরাধ করতে হলে সরাসরি যোগাযোগ ও সাহসের প্রয়োজন হতো, এখন সেখানে একটি মেসেজ, একটি গ্রুপ বা একটি পোস্টই যথেষ্ট। গোপন গ্রুপে পরিকল্পনা, চ্যাটে হুমকি, লাইভে অপমান; এগুলো কিশোরদের মানসিকতায় সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তুলছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমান বা প্রত্যাখ্যানের প্রতিশোধ নিতেই কিশোররা জড়িয়ে পড়ে সহিংস অপরাধে। বাস্তব জীবনের ক্ষোভ ও আক্রোশ তারা ঝাড়ে ভার্চুয়াল জগতের প্ররোচনায়, যার পরিণতি গিয়ে পড়ে রাস্তায়, স্কুলে কিংবা পাড়ায়।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভুয়া তথ্য ও বিকৃত কনটেন্ট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সত্য-মিথ্যার সীমারেখা অস্পষ্ট। কিশোররা অনেক সময় যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিশ্বাস করে নানা গুজব, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বা সহিংস মতাদর্শ। এ বিভ্রান্তি তাদের চিন্তাশক্তিকে দুর্বল করে এবং সহজেই প্রভাবিত করে অপরাধপ্রবণ গোষ্ঠীর দ্বারা। কেউ কেউ আবার অনলাইন গেমিং বা চ্যালেঞ্জের নামে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে গিয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, যেখানে সাহস প্রমাণের তাগিদই মুখ্য, বিবেচনা নয়।
তবে এর দায় এককভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার গভীরে যাওয়া হয় না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সামগ্রিক ভূমিকার দুর্বলতাও এখানে বড় কারণ। যখন পরিবারে সময় দেওয়ার অভাব, স্কুলে নৈতিক শিক্ষা ও মানসিক সহায়তার ঘাটতি থাকে, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই হয়ে ওঠে কিশোরদের প্রধান আশ্রয়। সেখানে সে যা দেখে, যা শোনে তাই তাকে গড়ে তোলে। নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারে এ মাধ্যম যেমন ক্ষতিকর, তেমনি সচেতন ও দায়িত্বশীল ব্যবহারে এটি হতে পারে ইতিবাচক পরিবর্তনের হাতিয়ার। সমস্যা তখনই প্রকট হয়, যখন দিকনির্দেশনা ছাড়া কিশোরকে একা ছেড়ে দেওয়া হয় ডিজিটাল জঙ্গলে।
কিশোর অপরাধ কমাতে হলে তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে শত্রু নয়, বরং একটি শক্তিশালী বাস্তবতা হিসেবে বুঝতে হবে। অভিভাবকদের প্রযুক্তিভীতি নয়, প্রযুক্তিজ্ঞান দরকার; যাতে তারা সন্তানদের অনলাইন জগৎ বুঝতে পারেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল লিটারেসি ও নৈতিক শিক্ষার সমন্বয় জরুরি, যাতে কিশোররা ভালো-মন্দের পার্থক্য শিখতে পারে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব রয়েছে ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ, বয়সভিত্তিক সুরক্ষা ও দ্রুত আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ নিশ্চিত করার।
শেষ পর্যন্ত কিশোর অপরাধের মূল লড়াইটি মানসিকতা ও মূল্যবোধের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সে মানসিকতাকে হয় গঠন করছে, নয় ভাঙছে। কোন পথে যাবে তা নির্ভর করে আমাদের সম্মিলিত সচেতনতার ওপর। কিশোরদের যদি আমরা শুধু অপরাধী হিসেবে দেখি, তাহলে সমস্যার সমাধান হবে না; তাদের মানুষ হিসেবে বুঝে, পথ দেখিয়ে, ডিজিটাল জগতের ঝুঁকি ও সম্ভাবনা দুটোই শেখাতে পারলেই শুধু এ অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী মাধ্যমকে ইতিবাচক পরিবর্তনের সঙ্গী করা সম্ভব।
আরিফুল ইসলাম রাফি, শিক্ষার্থী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!